আমরা তো সবাই বুঝতে পারলাম সৎ কাজের আদেশ আর অসৎ কাজের নিষেধ করা আমাদের মুসলিমদের ইসলাম আর ঈমানের জন্য কতোটা জরুরি। এই আয়াত আর হাদিসগুলো পড়ে প্রচন্ড মটিভেটেড হয়ে যখন তখন যেখানে সেখানে যাকে তাকে আদেশ নিষেধ করা শুরু করাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমল করার আগে প্রয়োজন ইলম, জ্ঞান। আমলটা কীভাবে করবো সেটা জানা ছাড়া সেই আমল করতে গেলে ভুল ছাড়া আর কিছু হবার আশা করাটা বোকামি।
সৎ কাজের আদেশ আর অসৎ কাজের নিষেধ সম্পর্কিত ফিকহ জানতে হলে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর জানতে হবে; কে, কাকে, কি, কখন, কীভাবে। অর্থাৎ,
১. আদেশ/নিষেধ কে করবে? (মুহতাসিব)
২. কাকে করবে? (মুহতাসিব আলাইহি)
৩. কখন করতে হবে?
৪. কীভাবে এই আদেশ বা নিষেধ করা হবে?
৫. কি বিষয় নিয়ে আদেশ বা নিষেধ করা যাবে? (মুহতাসিব ফিহী)
ইমাম গাযালি ‘আমর বিল মা’রুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’-এর কন্সেপ্টকে সংক্ষেপে নামকরণ করেছেন ‘হিসবা’ হিসেবে। সেই হিসেবে যে এই কর্ম করে তাকে বলা হয় ‘মুহতাসিব’, যাকে আদেশ নিষেধ করা হয় সে হচ্ছে ‘মুহতাসিব আলাইহি’, আদেশ-নিষেধ সম্পর্কিত বিষয়টি হলো ‘মুহতাসিব ফিহী’, আর স্বয়ং আদেশ বা নিষেধটিকে বলা হয় ‘ইহতিসাব’।
১। মুহতাসিব - আদেশ/নিষেধ দানকারী বিষয়ক শর্তাবলী
যে ব্যক্তি আদেশ কিংবা নিষেধ করবে তার ব্যাপারে পাঁচটি শর্ত আছে। সেগুলোর তিনটি বাধ্যতামূলক, আর দু’টি অতিরিক্ত। থাকলে খুব ভালো, তবে থাকাটা বাধ্যতামূলক শর্ত নয়।
প্রথম শর্ত – মুহতাসিবকে মুসলিম হতে হবে। কারণ আদেশ কিংবা নিষেধ করা মানে সম্মানের বিষয়। মুসলিম জীবিত থাকতে দ্বীনের এমন এক মূল স্তম্ভের আমল একজন কাফির করবে তা মুসলিমের জন্যে লজ্জাজনক! এছাড়া শরীয়তের কোন ওয়াজিব কিছু পালনের জন্যে কাফির বাধ্য নয়, ঠিক যেমন ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তার জন্যে সালাত আদায়, যাকাত প্রদান ইত্যাদি বাধ্যতামূলক হয়না। অন্যদিকে আদেশ/নিষেধ করা মানে কর্তৃত্ব খাটানোও। একজন কাফির কোন মুসলিমের উপর কর্তৃত্ব খাটাতে পারে না।
দ্বিতীয় শর্ত – মুকাল্লাফ হওয়া। শরীয়তের মুকাল্লাফ হওয়া মানে সেই ব্যক্তিকে মুসলিম হবার পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক ও মানসিকভাবে সুস্থ হতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক আর উন্মাদ যেমন সালাত-যাকাত ইত্যাদি আমল করার জন্য বাধ্য নয়, তেমনি হিসবা করাও তার জন্যে বাধ্যতামূলক নয়। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক কেউ যদি কোন মন্দকে চিনতে সক্ষম হয় আর ঈমান বা অভ্যাসের বশে সেটাকে বাঁধা প্রদান করে তবে সেজন্যে সে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে সোয়াব পাবে। আর মানুষের তাকে বাঁধা প্রদান করাও উচিত হবে না। ঠিক যেমন কোন অপ্রাপ্তবয়স্ক সালাত আদায় করলে সবাই সেটাকে বাঁধা দান তো দূরের কথা, উৎসাহ প্রদান করে।
তৃতীয় শর্ত – আদিল বা সৎ হওয়া। যদিও এটা বাধ্যতামূলক শর্ত নয়। কারণ তাহলে তো কেউই সৎ কাজের আদেশ আর অসৎ কাজ হতে নিষেধ করতে পারবে না! তবে মুহতাসিব যদি নিজে পরহেজগার ও আমলদার হয় তবে তার সৎ কাজের আদেশ মানুষ সহজে গ্রহণ করবে। আর অন্যদিকে সে যদি নিজেই অসৎ হয়, তবে তার সৎ কাজের প্রতি আদেশ কিংবা অসৎ কাজের নিষেধে মানুষের মধ্যে কোন প্রভাব পড়ার সম্ভাবনাই নেই।
তবে এখানে কিছু আলোচনা করা প্রয়োজন। মুহতাসিবকে কি সবরকম অসৎ কাজ থেকে মুক্ত হতে হবে? সেটা নয়। বরং, যদি এমন অসৎ কাজ থেকে সে নিষেধ করে যেটার সাথে সে যুক্ত নয় তবে সে সেই অসৎ কাজ হতে নিষেধ করতে পারবে। অথবা যদি এমন হয় যে, সে নিজে কোন মন্দ কাজের সাথে জড়িত যেটা নিয়ে তার নিজের মধ্যেও অনুশোচনা আছে, তবে লোকজন তা জানেনা। ফলে সে মানুষকে সেই মন্দ কাজ থেকেও নিষেধ করতে পারবে। আশা করা যায়, অন্যদের নিষেধ করতে করতে সেই নিষেধ নিজের অন্তরেও প্রভাব ফেলবে। ফলে সে ওই কাজ ছেড়ে দেবে।
চতুর্থ শর্ত – ক্বাদির বা সক্ষমতা থাকা। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ এই শর্তটি হলো কাউকে হিসবা করার সামর্থ্য, সক্ষমতা, সাহস ইত্যাদি থাকা। এই সক্ষমতা শারীরিক বা মানসিক যে কোন একটি হতে পারে। কারও মন্দ ঠেকানোর যদি শারীরিক সক্ষমতা না থাকে, কিংবা মানসিকভাবে আশঙ্কা হয় যে এতে তার বা পরিবারের উপর অত্যাচার হতে পারে, তবে তার জন্যে হিসবা করা বাধ্যতামূলক হবে না। এমতাবস্থায় অন্তর দিয়ে ঘৃণা করাই তার জন্যে যথেষ্ট হতে পারে। পূর্বে সাহল তুশতারি (রহঃ)-এর আছার থেকে আমরা সেটা বর্ণনা করেছি। এমনকি আদেশ বা নিষেধের ফল কি হবে সেটার ধারণার উপরও ব্যক্তির হিসবার বাধ্যবাধকতা নির্নয় করা যায়।
হিসবা কোন মুকাল্লাফ মুসলিমের উপর ওয়াজিব হবে কি না তার চারটি অবস্থা আছেঃ
অবস্থা #১ : হিসবা ফলপ্রসু হবে না আর ক্ষতির আশংকাও আছে। এমতাবস্থায় হিসবা না করাটাই কর্তব্য। অবস্থাভেদে তা হারামও হতে পারে। ফুদ্বাইল ইবন ইয়ায-এর বক্তব্য থেকে আমরা এর প্রমাণ পাই।
অবস্থা #২ : হিসবা ফলপ্রসু হবে আর ক্ষতিরও আশঙ্কা নেই। এমতাবস্থায় হিসবা করাটা ওয়াজিব।
অবস্থা #৩ : হিসবা ফলপ্রসু হবে তবে ক্ষতির আশঙ্কা আছে। এমতাবস্থায়ও হিসবা ওয়াজিব নয়, তবে মুস্তাহাব। যেমন, যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদের মাঝে ঢুকে তাদের নিশ্চিতভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করার যাবে, তবে এতে প্রাণ হারাবার আশঙ্কা আছে। এমতাবস্থায় সেটা করা মুস্তাহাব হবে। তবে যদি শত্রুর ক্ষতিও তেমন না হয় আর প্রাণও যায়, তবে কোন লাভই নেই। যাওয়াটা উচিত হবে না, হারামই হবে।
অবস্থা #৪ : হিসবা ফলপ্রসু হবে না তবে ক্ষতির আশঙ্কা নেই। এমতাবস্থায় হিসবা ওয়াজিব নয়, তবে মুস্তাহাব। সুফিয়ান আস সাওরির বক্তব্য থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, কারও মদের পাত্র যদি দূর থেকে পাথর মেরে ভেঙ্গে ফেলে পালিয়ে যেতে পারেন, তবে সেটা করা মুস্তাহাব হবে।
ওয়াজিব বাদে অন্যান্য অবস্থায় যদি আপনি হিসবা না করতে পারেন, তবে উচিত হবে সেই স্থানে কোনভাবেই না যাওয়া। বিশেষ করে যদি প্রথম অবস্থা হয় যে ক্ষতির আশঙ্কা আছে আবার আদেশ/নিষেধের কোন সুফলই হবে না, তবে সেখানে যাওয়াটাই হারাম হবে। যেমন, কোন নেতাকে আপনি প্রকাশ্যে মন্দ কাজে বাঁধা দিতে গেলে যদি আপনার ক্ষতির আশঙ্কা হয় এবং হিসবার কোন ফলই না আসার সন্দেহ করেন, তবে এক্ষেত্রে সেখানে যাওয়াটাই আপনার জন্যে হারাম হবে।
পঞ্চম শর্ত – শাসকের অনুমতি। এটাও বাধ্যতামূলক শর্ত নয়। কারণ সালাফদের থেকে প্রচুর ঘটনা বর্ণিত আছে যেখানে স্বয়ং সালাফ শাসককে কঠিন ভাষায় নাহি আনিল মুনকার তথা মন্দ কাজ হতে নিষেধ করেছেন। সেখানে নিশ্চয়ই শাসকের অনুমতি ছিল না?
তবে জনসাধারণের ইহতিসাব বিশেষ করে মন্দ কাজ হতে নিষেধ করার জন্যে শাসকের অনুমতি থাকা উপকারী। কেননা শাসকের অনুমতি থাকলে কেউ তার উপর চড়াও হতে পারবে না, আর সেও বিনা বাঁধা ও নির্ভয়ে জনগনের উপর মন্দ কাজের নিষেধ করতে পারবে। এছাড়াও অসৎ কাজের নিষেধে যদি কখনো শক্তি প্রদর্শনের প্রয়োজন পড়ে (অর্থাৎ মারধোর বা শাস্তি দেয়া), তখনও শাসকের অনুমতি থাকা জরুরি। নইলে সমাজে বড় ফিতনা হতে পারে। আইন সকলে নিজ হাতে তুলে নিলে ফাসাদ সৃষ্টি হতে বেশী সময় লাগবে না।
মুহতাসিবের তিনটি গুণ থাকা আবশ্যক
১. ইলম: যে বিষয়ে আদেশ বা নিষেধ করা হবে সে সম্পর্কিত জ্ঞান মুহতাসিবকে শরিয়তের সীমা ও বিধিবিধান বুঝতে সহায়তা করে, যাতে তিনি আইনের সীমা অতিক্রম না করেন।
২. পরহেজগারিতা: ধার্মিকতা ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে সহায়তা করে। শুধু জ্ঞান থাকলেই হয় না—আল্লাহভীতি থাকলে জ্ঞানকে যথাযথভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়।
৩. উত্তম আখলাক: এটি মূলভিত্তি। ভদ্রতা ও সহনশীলতা না থাকলে জ্ঞান ও পরহেজগারিতা থাকলেও রাগ বা অপমানের মুখে সেসব কাজে আসে না।
কিছু দিকনির্দেশনা
ধৈর্য অপরিহার্য। আল্লাহ লুকমানের উপদেশে ধৈর্যকে হিসবার সঙ্গে যুক্ত করেছেন: "তোমার প্রতি যা আসে, তা ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য কর।" (লুকমান ১৭)
মানুষের প্রশংসা বা উপকার পাওয়ার লোভ থেকে মুক্ত থাকা উচিত, যাতে মুহতাসিব কারও সাথে পক্ষপাত না করে।
মৌলিক নম্রতা ও কোমলতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নবী মুহাম্মদ (সা.) এমনকি কবিরাহ গোনাহকারীকেও কোমল ভাষায় উপদেশ দিতেন।
নিজে পারফেক্ট না হলেও ভালো কাজের আদেশ ও খারাপ কাজের নিষেধ করা থেকে বিরত থাকা উচিত নয়।
ভণ্ডামি পরিহার করা জরুরি: নিজে যেই গোনাহে লিপ্ত, তা অন্যকে নিষেধ করলে প্রভাব পড়ে না।
গোপনে ও স্নেহের সাথে সংশোধন অনেক সময় প্রকাশ্য তিরস্কারের চেয়ে বেশি ফলপ্রসূ। বহু আলেমের ঘটনা থেকে এ শিক্ষা পাওয়া যায়।
সত্যিকারের হিসবা তখনই কার্যকর হয়, যখন তা হয় একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।
প্রথম পর্বের লিংকঃ https://sahilridwan.substack.com/p/1c7#_ftn5