আশআরীরা আমাদের আল্লাহর গুণাবলীর প্রতি বিশ্বাসকে "আক্ষরিকতাবাদ" বলে অভিহিত করে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ'হ-এর বিশ্বাসকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। আরব (এমনকি আছারি) অনুবাদকরাও এই বিষয় নিয়ে খুব একটা যত্নশীল ছিলেন না। তারা "আলা-জাহিরিহা" (على ظاهرها) বাক্যাংশটিকে অযথাই "আক্ষরিকভাবে" হিসেবে অনুবাদ করেছেন। এটি আছারী আকিদার ভুল উপস্থাপনার প্রথম ত্রুটি। আমরা আল্লাহর সিফাতের কেবলমাত্র "আক্ষরিক" অর্থে বিশ্বাস করি না, কারণ এটি সঠিক পদ্ধতি নয়। আরবিতে "জাহির" (ظاهر) শব্দটির কিছুটা সঠিক অর্থ "literal/আক্ষরিক" হতে পারে, তবে আকীদার ক্ষেত্রে এর অর্থ আরও গভীর।
তাই সিফাতে আকিদার কন্টেক্সটে আরবি “জাহির” শব্দটিকে “আক্ষরিক” অনুবাদ করা যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ। কেন? সেটা ব্যাখ্যা করছি।
দেখুন, আমরা আল্লাহর গুণাবলীতে বিশ্বাস করি এবং তা গ্রহণ করি ঠিক যেভাবে আমাদের আছারি ইমামগণ বলেছেন: "আলা-জাহিরুহা", "আলা-জাহিরা", "আলা-জাওয়াহির"। এর অর্থ কী? সর্বাধিক সঠিক অনুবাদ হলো:
প্রকাশ্য
স্পষ্ট
অতএব, যখন আমরা বলি যে আমরা আল্লাহর গুণাবলীতে "জাহেরিভাবে" বিশ্বাস করি, এর মানে আমরা সিফাতগুলো সবচেয়ে স্পষ্ট/প্রকাশ্য অর্থ অনুযায়ী বিশ্বাস করি।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, "প্রকাশ্য অর্থ বলতে আসলে কি বোঝানো হচ্ছে?"
এর উত্তর দুইজন আছারি ইমাম সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেছেনঃ
১। ইমাম ইবন কুদামাহ আল-হানবালি তার "যাম্মুত তা’উইল"গ্রন্থে বলেছেন:
فإن قيل فقد تأولتم آيات وأخبارا فقلتم في قوله تعالى ( وهو معكم أين ما كنتم ) أي بالعلم ونحو هذا من الآيات والأخبار فيلزمكم ما لزمنا
قلنا نحن لم نتأول شيئا وحمل هذه اللفظات على هذه المعاني ليس بتأويل لأن التأويل صرف اللفظ عن ظاهره وهذه المعاني هي الظاهر من هذه الألفاظ بدليل أنه المتبادر إلى الأفهام منها وظاهر اللفظ هو ما يسبق إلى الفهم منه حقيقة كان أو مجازاযদি [কালামিরা] আমাদের বলে, “তোমরাও তো আয়াত ও হাদিসের তা’উইল করেছ। যেমন, আল্লাহর বাণী ‘যেখানেই তোমরা থাকো তিনি তোমাদের সাথে আছেন’ সম্পর্কে বলেছ, “এর অর্থ তাঁর জ্ঞানের সাথে এবং এ জাতীয় আয়াত ও হাদিসের অর্থ এমনই”, তাহলে আমাদের বিরুদ্ধে দেয়া তোমাদের যুক্তি তো তোমাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।”
আমরা বলি, “আমরা কিছুই তা’উইল করিনি। এই ধরনের শব্দগুচ্ছকে এই অর্থে ধারণা করা তা’উইল নয়। কারন তা’উইল হলো শব্দের অর্থকে তার জাহির থেকে সরিয়ে নেওয়া। আমরা যা বলছি তা হলো, শব্দের জাহির মানে হলো সেই পাঠ (আলফায) থেকে প্রথমেই যে বুঝ (ফাহম) আসে, সেটা হকিকত বা মাজায যা-ই হোক না কেন।”
এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট করতে, কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, "প্রথমে কারো মনে কী আসবে? সবার চিন্তাভাবনা তো ভিন্ন ভিন্ন!"
এর উত্তর হলো, ইবন কুদামাহ—সেই পাঠ থেকে প্রথমেই যে বুঝ আসে—দ্বারা বোঝাতে চেয়েছেন, সেটা আরবি ভাষার ব্যাকরণগত গঠন এবং সেই অর্থের সমর্থন অনুযায়ী হতে হবে। "সেই পাঠ থেকে" বাক্যাংশটি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এর অর্থ বোঝার বিষয়টি আরবি ভাষার নিয়মে সীমাবদ্ধ, যেহেতু “সেই পাঠটি” স্বয়ং আরবিতেই পঠিত। এখানে যার তার বুঝের কথা আসছে না। বরং আরবি ভাষার নিয়ম থেকে যেই বুঝটি প্রকাশ্য হয় সেটাই বোঝানো হচ্ছে।
যদি আমার এই ব্যাখ্যা আপনার কাছে বিশ্বাসযোগ্য না হয় তবে সামনের এই উক্তির মাধ্যমে আমি প্রমাণ দিচ্ছিঃ
২। ইমাম আয-যাহাবী তার “আল-উলু” কিতাবে লেখেনঃ
পরবর্তী সময়ের কিছু কালাম শাস্ত্রবিদ (আহলুন নযর) একটি নতুন আকিদা আবিষ্কার করেন। তাদের পূর্বে এ বিষয় আর কারও কাছ থেকে এসেছে বলে আমি জানি না। তারা বলেন: “এই সিফাতগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবেই চালিয়ে দেয়া (ইমরারুস সিফাত কামা জা’আত) হয় এবং এর তা’উইল করা হয় না; এই বিশ্বাসের সাথে যে এসবের জাহির অর্থ উদ্দেশ্য নয়।”
এখানে “জাহির” দুটি অর্থ প্রকাশ করতে পারে:
প্রথমত: শুধুমাত্র যে অর্থটুকু টেক্সট দ্বারা বোঝানো (দিলালাত আল-খিতাব) হয়েছে তা বাদে এর অন্য কোনো ব্যাখ্যা (তা'উইল) নেই। যেমনটা সালাফগন বলেছেন: "আরশে ইস্তিওয়া জানা বিষয়", অথবা সুফিয়ান এবং অন্যান্যরা যেমন বলেছেন: "এটির তিলাওয়াতই এর তাফসির"। অর্থাৎ ভাষায থেকেই ব্যাপারটা সুস্পষ্ট এবং পরিষ্কার। এর বাইরে ব্যাখ্যা (তা'উইল) বা বিকৃতির (তাহরিফ) প্রয়োজন নেই। এটাই সালাফদের মাযহাব। একই সাথে তারা সবাই একমত যে, এগুলো কোনোভাবেই মানবীয় গুণাবলীর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। কারণ আল্লাহ (বারি) সম্পূর্ণ অনন্য, তাঁর সত্তা এবং গুণাবলীর কোনো সাদৃশ্য নেই।
দ্বিতীয়ত: জাহির বলতে এমন কিছু বোঝানো হয় যা কল্পনায় আসে, ঠিক যেমনটা কোনো মানবীয় গুণের ক্ষেত্রে একটি চিত্র মনে অঙ্কিত হয়। এটি অবশ্যই “জাহির” শব্দের উদ্দেশ্য নয়। কারণ আল্লাহ একক এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ, যাঁর কোনো সাদৃশ্য নেই। তাঁর একাধিক গুণাবলী থাকার সত্বেও এগুলো সবই সত্য। তবে এগুলোর কোনো সাদৃশ্য বা তুলনা নেই।"
সুতরাং ইমাম আয-যাহাবি প্রমাণ করেছেন যে আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে আমাদের ইসবাত আরবি ভাষার নিয়ম অনুযায়ী সেগুলোর প্রকাশ্য ও স্পষ্ট অর্থের উপর ভিত্তি করে হয়, যেমনটা তিনি প্রথম পয়েন্টে ব্যাখ্যা করেছেন। আমাদের এই ইসবাত কোনো ব্যক্তির কল্পনা বা নিজস্ব ধারণা অনুযায়ী নয় (দ্বিতীয় পয়েন্ট)।
আরেকটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। লক্ষ্য করুন, ইবনুল-কুদামাহ শেষের দিকে বলেছেন, "সেটা হকিকত বা মাজায যা-ই হোক না কেন।" অর্থাৎ, কন্টেক্সট অনুযায়ী সিফাতের টেক্সটের স্পষ্ট বা প্রকাশ্য অর্থ আক্ষরিক কিংবা রূপক দুটোই হতে পারে।
এর মানে কী?
মাণে হলো, আছারীরা রূপক/মাজায অর্থকে অস্বীকার করেন না, যদিও তাদের মুতাকাল্লিম বিরোধীগন মানুষকে এমনটাই বলে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন।1 আহলুস সুন্নাহর নিকট সিফাতের রুপক অর্থ বা মাজায গ্রহণযোগ্য হবার শর্ত হলো তা আরবি ভাষা ও এর ব্যাকরণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। এ বিষয়ে ইমাম আস-সুয়ুতি "সাওন আল-মান্তিক" (১/৪৭-৪৮) গ্রন্থে ইমাম আশ-শাফেয়ী হতে বর্ননা করেনঃ
ماجهل الناس ولااختلفوا إلا لتركهم لسان العرب وميلهم إلى لسان ارسطوطاليس
"মানুষ আরবের ভাষা ত্যাগ করে অ্যারিস্টটলের ভাষার দিকে ঝুঁকে না পড়লে অজ্ঞতা ও মতবিরোধে জড়াতো না।"
মুতাযিলা, আশআরিয়্যা, মাতুরিদিয়্যাসহ সমস্ত কালাম মতবাদের জন্ম এই কারণেই যা ইমাম শাফেয়ী উল্লেখ করলেন। তার যুক্তি হলো, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল আছার তথা মূলধারাদের সাথে কালামী দলগুলোর মতভেদের মূল কারন হলো আরবি ভাষার অদক্ষতার পাশাপাশি অ্যারিস্টোটলীয় ধারণার আলোকে দ্বীনের নুসুস বোঝার প্রবণতা।
শেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। কিছু কিছু ইমাম বলেছেন যে, আল্লাহর গুণাবলীকে "হাকীকাতান" (সাধারণত "আক্ষরিক" অর্থে অনুবাদ করা হয়) বিশ্বাস ও বোঝা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, ইবন আব্দুল-বার আল-মালিকি রহিমাহুল্লাহ।
যখন “জাহির” শব্দের সাথে একই কন্টেক্সটে “হাকীকাতান” বলা হয় তখন এটাকে "অন্তর্নিহিত বাস্তবতা" হিসেবে বোঝানো হয়। উদাহরণস্বরূপ, শিয়ারা বা কিছু সুফিরা বলে যে সুন্নিরা কেবল ইসলামি টেক্সটের জাহির/বাহ্যিক অর্থই বোঝে। আর যা আল্লাহ ধর্মগ্রন্থে উদ্দেশ্য করেছেন সেটার প্রকৃত অন্তর্নিহিত (হাকীকি) অর্থ তারা নিজেরা জানে।
তাহলে বুঝতে হবে যে, আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে "হাকীকি" শব্দ প্রয়োগ মানে এই গুণাবলীগুলো সেগুলো রূপক, কল্পনাপ্রসুত বা অবাস্তব নয়, বরং বাস্তব, সত্য ও বিদ্যমান।2
এর একটি কারণ হতে পারে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়ার “মাজায”-কে সম্পুর্ণ অগ্রাহ্য করা। কিন্তু এটা তিনি করেছেন মাজাযের নিজস্ব সংজ্ঞায়ন করার মাধ্যমে। তাঁর নিকট শব্দ ও বাক্যের প্রাথমিক, প্রকাশ্য ও স্পষ্ট অর্থ সবই জাহির। অর্থাৎ, যেটাকে ট্রেডিশনালি মাজায বলা হয় সেটাই যদি শব্দ ও বাক্যের প্রাথমিক, প্রকাশ্য ও স্পষ্ট অর্থ হয় তবে সেটাকে তিনি মাজায বলতে অস্বীকার করেন। বরং তিনি বলছেন, মাজায হলো শব্দ ও বাক্যের প্রাথমিক, প্রকাশ্য ও স্পষ্ট অর্থ থেকে দূরবর্তী অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থের বিকৃতিকরণ। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ইবন কুদামাহ ও ইবন তাইমিয়ার মধ্যে এখানে সংজ্ঞাগত পার্থক্য বাদে প্রয়োগিক মতপার্থক্য নেই।
লেখাটি এই ব্লগ থেকে অনুপ্রাণিতঃ https://boriqee.blogspot.com/2016/04/the-athari-way.html



