ভূমিকা
সূরা হাদিদ মূলত ৫ম মঞ্জিলের সূরা। ৫০ তম সূরা থেকে টানা মাক্কি সূরা চলতে চলতে অবশেষে মাদানি সূরার ধারা শুরু হয়েছে। এর পরবর্তী ১০টি সূরা সবগুলোই মাদানি। আর সম্পূর্ণ কুরআনে মাদানি একত্রে সবচাইতে বেশী মাদানি সূরাগুলো এখানেই আছে। সূরা হাদিদ এই মাদানি ধারার প্রথম সূরা।
এই দশটি মাদানি সুরাগুলোর ৫টি শুরু হয়েছে আল্লাহ্র তাসবিহ দিয়ে। সাব্বাহা লিল্লাহি বা ইউসাব্বিহু লিল্লাহি এরকম শব্দাবলী দিয়ে। এই ৫টি সূরাকে তাই একত্রে নামকরণ করা হয়েছে “মুসাব্বিহাত” নামে। হাদিসে আছে যে, রাসুলুল্লাহ সঃ রাতে শোবার পূর্বে এই সুরাগুলো পাঠ করতেন। কারণ এগুলোতে এমন একটি আয়াত আছে যা হাজার আয়াত থেকেও উত্তম। ইবনে কাছিরের মতে সেটা হলো ৩ নম্বর আয়াতটিঃ
ہُوَ الۡاَوَّلُ وَ الۡاٰخِرُ وَ الظَّاہِرُ وَ الۡبَاطِنُ ۚ وَ ہُوَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ
তিনিই প্রথম ও শেষ ; প্রকাশ্য (উপরে) ও গোপন (নিকটে) আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।
প্রেক্ষাপট
মউদুদির মতে সূরাটি নাযিল হয়েছিল উহুদ যুদ্ধ ও হুদাইবিয়ার সন্ধির মধ্যবর্তী সময়কালে। সায়্যিদ কুতুবের মতে এটা হিজরি চতুর্থ সাল হতে মক্কা বিজয়ের মধ্যবর্তী সময়ে নাযিল হয়েছে। তাফসীরে আনওয়ারুল কুরআনে আছে যে, সুরাটির ৭ম আয়াত গাযওয়ায়ে তাবুকের আগে যখন মুসলিমরা জিহাদের জন্য প্রচুর আর্থিক সংকটে পড়েছিল তখন মুসলিমদের জিহাদের জন্যে চাঁদা দান করার নির্দেশ ও উৎসাহ দিয়ে এই সূরা নাযিল হয়েছে।
সূরাটির বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে যে হুদাইবিয়ার সন্ধি হতে মক্কা বিজয় কিংবা এর পরেরও বিভিন্ন সময়ে সময়ে এই সূরার আয়াতগুলো আলাদা আলাদা ভাবে নাযিল হয়ে থাকতে পারে। কারণ এখানে সেসব মুসলিমদের উদ্দেশ্য করা বক্তব্য দেয়া হয়েছে, যারা মুসলিমদের মধ্যে শান্তি ও সম্পদ বেড়ে যাবার কারণে ঈমানি দিক দিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সেই সম্পদের প্রতি খানিক দুর্বলতা তাঁদের পেয়ে বসেছিল। তাই যখন ক্রিটিক্যাল মুহূর্তে জিহাদের প্রয়োজনে প্রচুর সম্পদের প্রয়োজন হলো, তাঁদের কেউ কেউ কার্পণ্য করলো।
একই সাথে সেসব মুনাফিক আর আহলে কিতাব বিশেষ করে ইহুদিদের প্রতিও উদ্দেশ্য করে বক্তব্য এসেছে, যারা নিজেদের আল্লাহ্র প্রতি ঈমানদার দাবী করে। অথচ সেই আল্লাহ্র রাস্তাতেই যখন রাসুলুল্লাহ সঃ খরচ করতে আহ্বান করেন, তখন তারা শোনে না। তাদের অন্তরে যদি আসলেই ঈমান থাকতো তবে তারা খরচ করতোই।
মূল থিম
এই সূরাটির মূল থিম হলো আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করা। সুরাটির পরতে পরতে আল্লাহ বারবার করে মুমিনদের আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করতে বলছেন। সূরাটির নাম হাদিদ (লোহা) দেখে অনেকে একে জিহাদের সূরা মনে করতে পারে। কিন্তু আসলে এখানে জিহাদ নয়, বরং জিহাদের জন্যে, ইসলামের জন্যে, আল্লাহ্র জন্যে মুক্ত হস্তে ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ করছেন আল্লাহ। আর এটাকে খাঁটি ঈমানের পরিচায়ক বলছেন। যারা আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করেনা তাদের মুনাফিক বলছেন, যাদের অন্তর শক্ত হয়ে গেছে ইহুদিদের মতো। আর এই ব্যয় করলে অন্তরের রোগ দূর হয়, ঈমান বাড়ে এমন বলছেন।
আল্লাহ আরও সাহস যোগাচ্ছেন এই বলে যে, আসমান যমিনের ভাণ্ডার তাঁরই আর মানুষ কোন কিছুরই মালিক নয়, এমনকি নিজের সম্পদেরও নয়। সেই সম্পদ পূর্বে তার ছিল না, পরেও তার থাকবে না। অতএব আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করতে কার্পন্য করা উচিত নয়।
সূরাতে এর সাথে আল্লাহ মুনাফিক আর ইহুদিদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছেন যে, তোমরা যে নিজেদের আল্লাহ্র উপর ঈমানের দাবী করো, সেই দাবির পক্ষে প্রমাণ হবে শুধুমাত্র তাঁর রাসুলের উপর ঈমান আনার মাধ্যমে, আর আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করার মাধ্যমে।
এছাড়াও সূরার শুরুতে আল্লাহ্র বড়ত্ব-মহত্ত্ব-সিফাত, শেষের দিকে তাকদিরের বিশ্বাস, ইসলামের ন্যায্যতা আর খৃষ্টানদের বিদআত সম্পর্কে আলোচনা এসেছে।
সর্বশেষে খ্রিষ্টানদের ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে বলা হচ্ছে তারা যেন রাসুলুল্লাহ সঃ-এর উপরেও ঈমান আনে। ফলে তারা দ্বিগুণ পুরস্কার পাবে।
আয়াত ১
سَبَّحَ لِلّٰہِ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ۚ وَ ہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ
আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর তাসবিহ করে। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
তাসবিহ শব্দের অর্থ হলো আল্লাহ্র গুণগান করা, গ্লোরিফাই করা। এটা মুখ আর কর্ম দুটোর মাধ্যমেই সম্ভব। আমরা যিকির করলে, কুরআন পড়লে মুখ দ্বারা তাসবিহ হচ্ছে। আবার নামায পড়লে, শারীরিক ইবাদত করলে শরীর দ্বারা। সমস্ত সৃষ্টিকূল আল্লাহ্র তাসবিহ করছে মানে, সমস্ত কিছু আল্লাহ্র দেয়া নিয়মমাফিক চলছে। কোনকিছুই আল্লাহ্র ফয়সালা, ইচ্ছার বাহিরে নেই। এমনকি আমাদের ইনভলন্টারি শারীরিক কার্যক্রমও—যেমন হার্টবিট, ফুসফুস, রক্ত সঞ্চালন, ব্রেইন কাজ করা ইত্যাদি—সবকিছুই আল্লাহ্র নিয়মের অধীনে চলছে। এটাই হলো আল্লাহ্র তাসবিহ। সমস্ত কিছুই আল্লাহ্র নিয়মে চলছে, অর্থাৎ তাঁর ইবাদতে লিপ্ত, তাসবিহ করছে।
আসমান যমিনের সবকিছু একমাত্র আল্লাহ্রই তাসবিহ করছে বলে আমাদের বোঝানো হচ্ছে—
(এক) সমস্ত মাখলুকাতই যেহেতু আল্লাহ্র তাসবিহ করছে, তাই আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে আমাদের তাঁর তাসবিহ করার দায়িত্ব আরও বেশী।
(দুই) মুসলিমদের শান্ত করা হচ্ছে যে, এইযে বেশীরভাগ মানুষ এক আল্লাহ্র ইবাদত করছে না এটা দেখে মন খারাপ করো না। সমস্ত কিছুই আল্লাহ্র ইবাদত করছে, আল্লাহ্র তাদের ইবাদতের দরকার নেই। বরং এই কাফিররাই হলো তাসবিহ না করার দিক দিয়ে মাইনোরিটি, মেজোরিটি নয়।
আর তিনিই হলেন মহাপ্রাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়—কথাটি বলার মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছে যেহেতু তিনিই আযিয, তাসবিহহের অধিকার একমাত্র তাঁরই। কোনকিছুই তাঁর আয়ত্ত্বের বাইরে নেই। আর তিনিই যেহেতু হাকিম, সমস্ত কিছু সৃষ্টির পেছনে অবশ্যই হিকমত আছে। এইযে কাফিররা আল্লাহ্র তাসবিহ করছে না, দুনিয়াতে একমাত্র মানুষই ইনসাফ করছে না, আল্লাহ্র হেকমতের দাবী হলো তিনি ইনসাফ ব্যালেন্স তৈরি করবেনই। এই দুনিয়াতে না হলেও আখিরাত বানিয়ে ইনসাফ করবেনই। এর মাধ্যমে তাঁর আল-হাকিম নামের প্রকাশ্য বাস্তবায়ন আমরা শেষেও দেখতে পাবোই। অতএব কাফিররা! সবকিছুই তাসবিহ করছে, বাঁচতে চাইলে তোমরাও তাসবিহ করো। হে মুসলিমরা, দুঃখ করো না। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, তিনি প্রজ্ঞার বাস্তবায়ন করে দেখাবেন একসময় না একসময়।
আয়াত ২
لَہٗ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ۚ یُحۡیٖ وَ یُمِیۡتُ ۚ وَ ہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ
আসমানসমূহ ও যমীনের সর্বময় কর্তৃত্ব তাঁরই ; তিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান; আর তিনিই সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
আয়াত ৩
ہُوَ الۡاَوَّلُ وَ الۡاٰخِرُ وَ الظَّاہِرُ وَ الۡبَاطِنُ ۚ وَ ہُوَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ
তিনিই প্রথম ও শেষ ; প্রকাশ্য (উপরে) ও গোপন (নিকটে) আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।
ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, কোনো সময় তোমার অন্তরে আল্লাহ তা’আলা ও ইসলাম সম্পর্কে শয়তানী কুমন্ত্রণা দেখা দিলে هُوَالْاَوَّلُ وَالْاٰخِرُ وَالظَّاهِرُوَالْبَاطِنُ وَهُوَبِكُلِّ شَىْءٍعِلِيْمٌ আয়াতখানি আস্তে পাঠ করে নাও। [আবু দাউদ ৫১১০]
এই আয়াতের তাফসীর এবং “আউয়াল”, “আখের”, “যাহের” ও “বাতেন” এ শব্দ চারটির অর্থ সম্পর্কে তফসীরবিদগণের বহু উক্তি বর্ণিত আছেঃ
· তন্মধ্যে “আউয়াল” শব্দের অর্থ তো প্ৰায় নির্দিষ্ট; অর্থাৎ অস্তিত্বের দিক দিয়ে সকল সৃষ্টজগতের অগ্রে ও আদি। কারণ, তিনি ব্যতীত সবকিছু তাঁরই সৃজিত। তাই তিনি সবার আদি।
· “আখের” এর অর্থ কারও কারও মতে এই যে, সবকিছু বিলীন হয়ে যাওয়ার পরও তিনি বিদ্যমান থাকবেন। [সা’দী]
· ইমাম বুখারী বলেন, যাহের’ অর্থ জ্ঞানে তিনি সবকিছুর উপর। অনুরূপ তিনি ‘বাতেন’ অৰ্থাৎ জ্ঞানে সবকিছুর নিকটে।
· তিনি ব্যক্ত বা প্রকাশমান। অর্থাৎ, তিনি সবার উপর জয়ী, তাঁর উপর কেউ জয়ী নয়। তিনি গুপ্ত বা অপ্রকাশমান। অর্থাৎ, যাবতীয় গোপন খবর একমাত্র তিনিই জানেন। অথবা তিনি মানুষের দৃষ্টি ও জ্ঞানের অন্তরালে। (ফাতহুল ক্বাদীর)
· যাহির অর্থ আল্লাহ অস্তিত্বের প্রমাণের দিক দিয়ে প্রকাশ্য, স্পষ্ট। একইসাথে মানুষের দৃষ্টি, বুঝ, জ্ঞানের আয়ত্তের বাহিরে। তাই তিনি বাতেন। (যামাখশারি)
وَ ہُوَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ অর্থাৎ “তিনিই সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান” অংশটির তাফসীর আল্লাহ নিজেই করছেন পরের আয়াতে।
আয়াত ৪
ہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ ثُمَّ اسۡتَوٰی عَلَی الۡعَرۡشِ ؕ یَعۡلَمُ مَا یَلِجُ فِی الۡاَرۡضِ وَ مَا یَخۡرُجُ مِنۡہَا وَ مَا یَنۡزِلُ مِنَ السَّمَآءِ وَ مَا یَعۡرُجُ فِیۡہَا ؕ وَ ہُوَ مَعَکُمۡ اَیۡنَ مَا کُنۡتُمۡ ؕ وَ اللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ
তিনি ছয় দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উখিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন--তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।
“তিনি ছয় দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন।”—এই অংশটি আকিদার আলোচনা আর প্রেক্ষাপটের আলোচনা দুইভাবে করা যায়। প্রথমে প্রেক্ষাপটের আলোচনা করছি।
ইহুদি ও খৃষ্টানরা আল্লাহ্র উপর ঈমান আনলেও তাদের ঈমানের বিভিন্নরকম ঘাটতি আছে। আল্লাহ্র নাম ও গুণাবলী, তাঁর রুবুবিয়্যাত, উলুহিয়্যাতে ভয়াবহ ভুল আছে বলেই তারা কাফের ও মুশরিক। আল্লাহ্র ব্যাপারে তাদের সবচাইতে বড় ভুল আকিদার একটি হলো, আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টিকার্য ছয় দিনে শেষ করার পর সপ্তম দিন ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিলেন। নাউযুবিল্লাহ।
Genesis 31-32: “God saw all that he had made—and it was very good! There was evening, and there was morning, the sixth day. Thus the heavens and the earth were completed in all their vast array. By the seventh day God had finished the work he had been doing; so on the seventh day he rested from all his work. Then God blessed the seventh day and made it holy, because on it he rested from all the work of creating that he had done.”
অথচ আমাদের আকিদা হলো, আল্লাহ সমস্ত সৃষ্টিকর্ম সৃষ্টি করবার পর সেগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রতিপালন করেন, দেখাশোনা করেন। এতে তিনি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হন না। তন্দ্রা বা ঘুমও তাঁকে স্পর্শ করে না। [আয়াতুল কুরসি দ্রষ্টব্য]
আল্লাহ শুরুতেই তাদের বদ আকিদা রদ্দ করে বলছেন, “তিনি ছয় দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন।” অর্থাৎ অতঃপর তিনি ক্ষমতার, মালিকের, রাজত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হলেন। এটা বাস্তবিকভাবে (হাকিকি) যেমন সত্য, উপমাগতভাবেও (মাজায) সত্য। দুটোর মধ্যে কন্ট্রাডিকশন নেই।
ইমাম ইবনে কাছির বলেন,
ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ এই আয়াতের ব্যাখ্যা লইয়া মানুষের ভিতর প্রচুর মতভেদ দেখ দিয়াছে। এখানে তাহা সবিস্তারে আলোচনা সম্ভব নহে। এই স্থানটিতে আমরা সলফে সালেহীনদের মাযহাব অনুসরণ করিব। তাহারা হইলেন ইমাম মালিক, আওযাঈ, সাওরী, লাইস ইন্ন সা'দ, শাফিঈ, আহমদ ও ইসহাক ইন্ন রাহবিয়া প্রমুখ পূর্বসূরি মুসলিম ইমামবৃন্দ। তাহাদের মাযহাব হইল আরশের উপর আল্লাহ্ তা'আলার সমাসীন হওয়া ইহার আকৃতি, উপমা ও শূন্যতা যাহা মানুষের খেয়ালে আসিতে পারে তাহা হইতে মুক্ত ও পবিত্র। আল্লাহ্ যেমন কোন সৃষ্টির সহিত তুলনীয় নহেন, তেমনি কোন সৃষ্টিও তাহার তুল্য নহে। কারণ তিনি বলেন: ليس كمثلِهِ شَيْءٍ وَ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ সহিত তুলনীয় নহে (৪২ : ১১)। তাই শায়খুল বুখারী নুআইম ইন্ন হাম্মাদ খুযাঈসহ বিভিন্ন ইমাম যাহা বলিয়াছেন ব্যাপারটি তাহাই। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ্র আকৃতি বা তাঁহার কোন সৃষ্টির তুলনা করে সে কাফির। যদি কেহ তাঁহার নিজস্ব বিশেষ গুণের ব্যাপার নিয়া বিতর্ক তোলে সে কাফির। এমন কি তাঁহার বৈশিষ্ট্যের সহিত তাঁহার কোন রাসূলের বৈশিষ্ট্যও তুলনীয় নহে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ্ পাকের জন্য তাহাই প্রমাণ করে যাহা তাঁহার সুস্পষ্ট বাণী ও বিশুদ্ধ হাদীসে বিদ্যমান এবং যাহা তাঁহার অসীম অস্তিত্বের জন্যে শোভনীয় ও উপযোগী কেবল সেই লোকই হিদায়েতের অনুসরণ করে। [সূরা আরাফ, আয়াত ৫৪ এর তাফসীর]
“He did not isolate Himself in some corner after delegating their administration to others. He Himself is governing them by being stationed on His throne. Wherever the six day creation of the heavens and the earth is mentioned, the purpose is to direct attention to the elaborate arrangement made by the Almighty in creating them.” [তাদাব্বুরে কুরআন]
یَعۡلَمُ مَا یَلِجُ فِی الۡاَرۡضِ وَ مَا یَخۡرُجُ مِنۡہَا وَ مَا یَنۡزِلُ مِنَ السَّمَآءِ وَ مَا یَعۡرُجُ فِیۡہَا ؕ وَ ہُوَ مَعَکُمۡ اَیۡنَ مَا کُنۡتُمۡ ؕ وَ اللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ
“তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উখিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন--তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।”
এই অংশটি আগের আয়াতের শেষ অংশ— وَ ہُوَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ অর্থাৎ “তিনিই সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান”—এর তাফসীর। অর্থাৎ, তিনি তাঁর মূলকের সমস্ত কর্মকান্ড সূক্ষ্মভাবে ও বিস্তারিতভাবে নিজে পরিচালনা করছেন।
আয়াত ৫
لَہٗ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ وَ اِلَی اللّٰہِ تُرۡجَعُ الۡاُمُوۡرُ
আসমানসমূহ ও যমীনের সর্বময় কর্তৃত্ব তাঁরই এবং আল্লাহ্রই দিকে সব বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে।
لَہٗ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ অংশটি ২য় আয়াতে প্রথমবার এসেছিল। এখানে রিপিট হচ্ছে। স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে সবকিছুর মালিক কে?
وَ اِلَی اللّٰہِ تُرۡجَعُ الۡاُمُوۡرُ অর্থাৎ “আল্লাহ্রই দিকে সব বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে”—অংশটি আগের আয়াতের দ্বিতীয়ভাগের মুখতাসার।
The implication is that not only is the Almighty aware of everything, He is practically the fountainhead and source of all affairs. All matters are initiated at His behest, and their report is presented before Him alone. His taskforce turns to Him for all directives, and present their performance report before Him only. Neither is anyone authorized to do anything at his own discretion nor is anyone immune from being accountable before Him. [তাদাব্বুরে কুরআন]
আয়াত ৬
یُوۡلِجُ الَّیۡلَ فِی النَّہَارِ وَ یُوۡلِجُ النَّہَارَ فِی الَّیۡلِ ؕ وَ ہُوَ عَلِیۡمٌۢ بِذَاتِ الصُّدُوۡرِ
তিনিই রাতকে প্রবেশ করান দিনে আর দিনকে প্ৰবেশ করান রাতে এবং তিনি অন্তরের বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক অবগত।
When he alone brings the light of the day and the darkness of the night and He brings forth the light of the day to disperse the all-embracing darkness and unveils everything covered by it, so how can anything remain hidden from Him? He is fully aware of the most concealed secrets and is even aware of the secrets of the hearts. [তাদাব্বুরে কুরআন]
সূরার শুরু হতে ৬ নং আয়াতের অর্ধেক পর্যন্ত যদি সুরাটির ভূমিকা হিসেবে ধরি, তবে পরবর্তী আলোচনার আগে আল্লাহ একটি ওয়ার্নিং মেসেজ দিয়ে দিচ্ছেন, “তিনি অন্তরের বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক অবগত।” কারণ, সূরাটির পরবর্তী অংশেই আমরা দেখবো আল্লাহ নিজেদের সাচ্চা ও পরিপূর্ণ ঈমানদার দাবী মানুষদের ঈমানের প্রমাণ দিতে আল্লাহ্র পথে ব্যয় করতে উৎসাহ দিচ্ছেন। কিন্তু মানুষের অন্তরে যে আসলে ঈমানের ঘাটতি আছে, মুনাফেকি আর কুফরি আছে, সেটা তিনি খুব ভালো করেই জানেন। তাদের অন্তরের খবর প্রকাশ করে দেবার আগেই তিনি এই ওয়ার্নিং মেসেজ দিচ্ছেন যে “আমি কিন্তু অন্তরের খবর জানি। অতএব, তোমরা তাড়াতাড়ি আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করো। নইলে প্রকৃত অবস্থা ফাঁস করে দেব।” ঠিক এরপরের আয়াত হতেই অন্তরের সেই প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ একে একে ফাঁস করা শুরু করেছেন।
আয়াত ৭
اٰمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَ رَسُوۡلِہٖ وَ اَنۡفِقُوۡا مِمَّا جَعَلَکُمۡ مُّسۡتَخۡلَفِیۡنَ فِیۡہِ ؕ فَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ وَ اَنۡفَقُوۡا لَہُمۡ اَجۡرٌ کَبِیۡرٌ
তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যা কিছুর উত্তরাধিকারী করেছেন তা হতে ব্যয় কর। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও ব্যয় করে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।
اٰمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَ رَسُوۡلِہٖ
It is evident later from contextual indicators that it is directed to a certain category of Muslims and to the Hypocrites who though had laid claim to faith in God and His Prophet (sws), but started to evade and desist from its demands of spending and waging war for the cause of God when they arose before them. It is by addressing such claimants of faith that they are told to profess faith in God and His Prophet in the real sense of the word.
وَأَنفِقُواْ
The implication is that the obligation a person owes to his faith in God and the Prophet (sws) does not stand fulfilled by merely verbally expressing faith; it is essential for its fulfillment that when they are called to sacrifice their life and wealth for the cause of God, they should positively respond to it.
جَعَلَكُم مُّسۡتَخۡلَفِينَ
অর্থাৎ, এই ধন এর পূর্বে অন্য কারো নিকটে ছিল। এতে এ কথার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে যে, এ ধন তোমার নিকটেও থাকবে না। অপর কেউ এর উত্তরাধিকারী হবে। তোমরা যদি এ মালগুলো আল্লাহর পথে ব্যয় না কর, তবে পরে যারা এগুলোর মালিক হবে, তারা আল্লাহর পথে সেগুলো ব্যয় করে তোমাদের চাইতেও বেশী সৌভাগ্য লাভ করতে পারবে। আর তারা যদি এগুলোকে আল্লাহর অবাধ্যতার পথে ব্যয় করে, তবে তোমরাও অসৎকার্যে সাহায্য করার অপরাধে ধরা খেতে পার। (ইবনে কাসীর)
“তোমাদের এই সম্পদের খলিফা করা হয়েছে”—অর্থাৎ, কেউ যদি আমাকে কিছু সম্পদ দিয়ে বলে এই এই কাজে সেটা ব্যয় করবে, তবে সেই কাজে ব্যয় করা আমার পক্ষে খুব সহজ হবে। কারণ, প্রথমত সম্পদটাই আমার না। দ্বিতীয়ত, এটা অমুক অমুক খাতে ব্যয় করবার জন্যেই দেয়া হয়েছে। অতএব সেগুলো ব্যয় করতে আমার কোন প্রকার কৃপণতাই হবার কথা নয়।
হাদীসে এসেছে যে, "মানুষ বলে আমার মাল, আমার মাল। অথচ তোমার মাল প্রথমতঃ সেটা, যেটা তুমি খেয়ে শেষ করেছ। দ্বিতীয়তঃ সেটা, যেটা তুমি পরিধান করে নষ্ট করেছ এবং তৃতীয়তঃ সেটা, যেটা তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করে পরকালের জন্য সঞ্চয় করেছ। এ ছাড়া যা কিছু থাকবে, তা সবই অন্যদের ভাগে আসবে।" (মুসলিমঃ যুহুদ অধ্যায়, মুসনাদ আহমাদ ৪/২৪) [আহসানুল বায়ান]
These people should keep in consideration the fact that they are neither the creators nor the owners of this wealth; God has, in reality, entrusted it to them so that they may use it within the limits He has set forth and be ready to give an account of each and every penny to Him. The implication is that when they are not the creators and masters of this wealth and only its trustees and when a demand comes to them from the very being who has entrusted them with this to wealth to spend it, then why are they showing stinginess in this?
আয়াত ৮
وَ مَا لَکُمۡ لَا تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ ۚ وَ الرَّسُوۡلُ یَدۡعُوۡکُمۡ لِتُؤۡمِنُوۡا بِرَبِّکُمۡ وَ قَدۡ اَخَذَ مِیۡثَاقَکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ
তোমাদের কি হল যে, তোমরা আল্লাহতে ঈমান আনছো না অথচ রসূল তোমাদেরকে তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আনতে ডাকছেন? আর তিনি ˹তো ইতিমধ্যেই˺ তোমাদের নিকট হতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন, যদি তোমরা ঈমানদার হও।
আমরা ইতিপূর্বে আল্লাহ্র ওয়ার্নিং দেখেছি যে, তিনি অন্তরের বিষয়াদি সব জানেন। এরপর তিনি আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করতে বলেছেন। আমি ধারণা করছি, পূর্বের এই আয়াতের পর কিছুটা সময় দেয়া হয়েছিল মদিনার অধিবাসীদের। তাদের সময় দেয়া হয়েছিল জিহাদ ও ইসলামের জন্য সম্পদ দেবার, খরচ করার। কিন্তু আশানুরূপ ফলাফল আসেনি বিধায় আল্লাহ এখানে ধমকের স্বরে কৈফিয়ত তলব করছেন যে, “কিসে তোমাদের আল্লাহ্র প্রতি সম্পূর্ণরুপে ঈমান আনতে বাঁধা দিল?” এর পেছনে ইশারা এই যে, তাদের পরিপূর্ণ ঈমানের ঘাটতির কারণেই আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করছে না। অর্থাৎ আল্লাহ তাদের অন্তরের অবস্থা এখন প্রকাশ করে দিচ্ছেন যা তিনি আগে থেকেই জানতেন।
This verse counsels in a rebuking manner such weak Muslims: when they have pledged a covenant of "to listen and obey" at the hands of the Prophet (sws), then this requires that they follow with letter and spirit whatever directive be revealed by God and whatever call be given to them by the Prophet (sws); however, in fact, they are evading the calls of the Prophet (sws) to spend for the cause of God; what type of pledge and what sort of faith is this.
And if the condition of their faith and pledge is like this while the Prophet (sws) is among them and he himself is asking them to fulfill the requirements of faith, what will happen later when the Prophet (sws) is no longer among them? [Tadabbur e Quran]
Once the Prophet (pbuh) asked his companions, “Which of the believers is amazing to you in terms of faith?” They replied, “Angels.” He said, “Why should they not believe when they are right with their Lord?” So they said, “Prophets.” He said, “Why should they not believe when Revelations come to them?” They said, “Then we.” He said, “Why should you not believe when I am right among you?” But rather the most amazing in terms of belief are the people who will come after you. They will find a Scripture and believe in what it states.” [Ishraq al Ma’ani]
Two things are clearly expressed in this verse:
Firstly, it is an essential requirement of faith that a person professes faith in everything revealed by God and to which the Prophet (sws) called them. Denying any one of them is like denying all.
Secondly, deeds are only a manifestation of faith, and spending for the cause of God occupies special importance in nurturing and strengthening faith. Thus here, for this very reason, the call to spend for the cause of God has been expressed as the call to faith. [Tadabbur e Quran]
ইবনে কাসীর (রঃ) أخذ ক্রিয়ার 'ফা-য়েল' (কর্তৃপদ বা তিনি বলতে) রসূলকে বুঝিয়েছেন এবং অর্থ নিয়েছেন, সেই বায়আত বা অঙ্গীকার, যা রসূল (সাঃ) সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-দের নিকট থেকে নিতেন। আর তা হল, সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় তাঁর কথা শুনতে ও মানতে হবে।
The word مِيثَاقَ : pledge here refers to the pledge of "to listen and obey" which every Muslim was required to do at the hands of the Prophet (sws).
وَ اذۡکُرُوۡا نِعۡمَۃَ اللّٰہِ عَلَیۡکُمۡ وَ مِیۡثَاقَہُ الَّذِیۡ وَاثَقَکُمۡ بِہٖۤ ۙ اِذۡ قُلۡتُمۡ سَمِعۡنَا وَ اَطَعۡنَا ۫
আর স্মরণ কর, তোমাদের উপর আল্লাহর নেয়ামত এবং যে অঙ্গীকারে তিনি তোমাদেরকে আবদ্ধ করেছিলেন তা; যখন তোমরা বলেছিলে, ‘শুনলাম এবং মেনে নিলাম’। [সূরা মা’ইদাহ, আয়াত ৭]
উবাদা ইবনে সামেত থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের থেকে এই মর্মে বাইয়াত গ্ৰহণ করেছিলেন যে, আমরা যেন সক্রিয়তা ও নিস্ক্রিয়তা উভয় অবস্থায় শুনি ও আনুগত্য করে যাই এবং স্বচ্ছলতা ও অস্বচ্ছলতা উভয় অবস্থায় আল্লাহর পথে খরচ করি, ভাল কাজের আদেশ করি এবং মন্দ কাজে নিষেধ করি, আল্লাহ সম্পর্কে সত্য কথা বলি এবং সেজন্য কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় না করি।” [মুসলিম: ১৭০৯, মুসনাদে আহমদ: ৫/৩১৬]।
ইমাম ইবনে জারীরের নিকট এর 'ফা-য়েল' হল আল্লাহ। অর্থ হল, সেই অঙ্গীকার, যা মহান আল্লাহ সকল মানুষের কাছ থেকে তখন নিয়েছিলেন, যখন তাদেরকে আদম (আঃ)-এর পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করেছিলেন। যেটাকে عهد أَلَسْتُ বলা হয়; যার আলোচনা সূরা আ'রাফ ৭:১৭২ নং আয়াতে রয়েছে।
اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ ––যদি তোমরা ঈমানদার হও। অর্থাৎ যদি তোমাদের আসলেই ঈমান থেকে থাকে, নিজেদের যে মুমিন দাবী করছো তা যদি আসলেই প্রমাণ করতে চাও, তবে রাসুলের ডাকে সাড়া দাও আর আল্লাহ রাস্তায় ব্যয় করো।
আয়াত ৯
ہُوَ الَّذِیۡ یُنَزِّلُ عَلٰی عَبۡدِہٖۤ اٰیٰتٍۭ بَیِّنٰتٍ لِّیُخۡرِجَکُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ؕ وَ اِنَّ اللّٰہَ بِکُمۡ لَرَءُوۡفٌ رَّحِیۡمٌ
তিনিই তাঁর বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ নাযিল করেন, তোমাদেরকে অন্ধকার হতে আলোতে আনার জন্য। আর নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি করুণাময়, পরম দয়ালু।
The words ءَايَٰتٍۢ بَيِّنَٰتٍ though refer to all the guidance which people were receiving through the Prophet (sws); however, here specifically those verses are referred to which relate to spending and waging war for the cause of God, and which in part are also mentioned with clear arguments further down in the sūrah.
Here Zulumat refers to the darkness of one’s lustful desires and of the love of this world the sole remedy for which is to spend in the way of God and the word Noor refers to the radiance produced by spending in the way of God and which is mentioned ahead in verse twelve. [Tadabbur e Quran]
অর্থাৎ তিনি কুরআন অবতীর্ণ করেছেন এবং (এর) সত্যতার নিদর্শনাদি দান করেছেন, যাতে এসবের দ্বারা তোমাদেরকে কুফর ও মূর্খতার অন্ধকার থেকে বের করে ঈমান ও ইলমের আলোতে নিয়ে আসেন। বস্তুত এটি আল্লাহর বড় দয়া ও মেহেরবানী। যদি তিনি দয়া-মায়াহীন হতেন, তবে উক্ত আঁধারে ফেলে রেখে তোমাদের ধ্বংস করে দিতেন অথবা ঈমান আনার পরও পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ ক্ষমা করতেন না। [তাফসীরে উসমানি]
আয়াত ১০
وَ مَا لَکُمۡ اَلَّا تُنۡفِقُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَ لِلّٰہِ مِیۡرَاثُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ لَا یَسۡتَوِیۡ مِنۡکُمۡ مَّنۡ اَنۡفَقَ مِنۡ قَبۡلِ الۡفَتۡحِ وَ قٰتَلَ ؕ اُولٰٓئِکَ اَعۡظَمُ دَرَجَۃً مِّنَ الَّذِیۡنَ اَنۡفَقُوۡا مِنۡۢ بَعۡدُ وَ قٰتَلُوۡا ؕ وَ کُلًّا وَّعَدَ اللّٰہُ الۡحُسۡنٰی ؕ وَ اللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ
আর তোমাদের কি হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করছ না? অথচ আসমানসমূহ ও যমীনের মীরাস তো আল্লাহ্রই। তোমাদের মধ্যে যারা বিজয়ের আগে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করছে, তারা (এবং পরবর্তীরা) সমান নয়। এরা মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ তাদের চেয়ে যারা পরবর্তী কালে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ্ উভয়ের জন্যই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর তোমারা যা কর আল্লাহ্ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।
وَ مَا لَکُمۡ اَلَّا تُنۡفِقُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَ لِلّٰہِ مِیۡرَاثُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ
আল্লাহর রাস্তায় খরচ না করার তো কোনই মানে নেই যেহেতু আমাদের সম্পদ সবই তাঁর দেয়া। পূর্বের আয়াতে দেখেছি আল্লাহ আমাদের এই সম্পদের খলিফা বানিয়েছেন মাত্র। আমরা নিজেরাই এই সম্পদ পেয়েছি অন্যের কাছ থেকে। এসবের কিছুই কবরে নিতে পারবো না। আবার সেটা মৃত্যুর পর আরেকজনের কাছে চলে যাবে। অন্যদিকে সমস্ত সম্পদের আসল মিরাস তো আল্লাহরই। অতএব, কৃপণতা করার কারণ নেই। কেউ আমাকে টাকা রাখতে দিলে যেমন তার যখন তখন সেটা চাইবার অধিকার আছে, তেমনি আল্লাহও চাইতে পারেন। আমার গাইগুই করার অধিকার নেই।
৮ নং আয়াতের শেষ বাক্যের সাথে এই আয়াতের প্রথম বাক্য যদি মিলিয়ে পড়ি তবে অর্থ দাঁড়ায় অনেকটা এরকম—"যদি তোমরা আসলেই মুমিন হয়ে থাকো তবে তোমাদের কি হলো যে আল্লাহ্র পথে ব্যয় করছো না?”
লক্ষ্য করুন, এই দুটো আয়াতই একই প্রশ্নের ধরণ দিয়ে শুরু হচ্ছে, وَ مَا لَکُمۡ অর্থাৎ তোমাদের কি হলো? কীসে তোমাদের আটকাচ্ছে? ৭ম আয়াতে প্রশ্ন হচ্ছে, “তোমাদের কি হলো যে পরিপূর্ণ ঈমান আনছো না?” আর এখানে প্রশ্ন হলো, “তোমাদের কি হলো যে ব্যয় করছো না?” অর্থাৎ রেটোরিক্যাল প্রশ্ন হিসেবে দেখলে ব্যাপারটা এমন হয় যে, “তোমরা খরচ করছো না কারণ তোমাদের অন্তরে প্রকৃত ঈমান নেই। আর যদি ঈমান থেকেই থাকে তবে খরচ করছো না কেন?”
এখানে ঈমান বলতে আল্লাহ্র ও রাসুলের সম্পূর্ণ আনুগত্য, আল্লাহ্র রুবুবিয়্যাতের উপর বিশ্বাস, সমস্ত সম্পদ তাঁরই দেয়া আর তাঁর উপরেই সমস্ত ভরসা রাখা বোঝা যাচ্ছে।
আল্লাহর পথে অর্থ খরচ করতে গিয়ে তোমাদের কোন রকম দারিদ্র বা অস্বচ্ছলতার আশংকা করা উচিত নয়। কেননা, যে আল্লাহর উদ্দেশ্যে তা খরচ করবে তিনি যমীন ও উর্ধ জগতের সমস্ত ভাণ্ডারের মালিক। আজ তিনি তোমাদেরকে যা দান করে রেখেছেন তাঁর কাছে দেয়ার শুধু ঐ টুকুই ছিল না। কাল তিনি তোমাদেরকে তার চেয়েও অনেক বেশী দিতে পারেন। [ইবন কাসীর]
لَا یَسۡتَوِیۡ مِنۡکُمۡ مَّنۡ اَنۡفَقَ مِنۡ قَبۡلِ الۡفَتۡحِ وَ قٰتَلَ ؕ اُولٰٓئِکَ اَعۡظَمُ دَرَجَۃً مِّنَ الَّذِیۡنَ اَنۡفَقُوۡا مِنۡۢ بَعۡدُ وَ قٰتَلُوۡا
সুরা ওয়াকিয়াতে আমরা দেখেছি, সাবিকুনাল আউয়ালুনরা পুর্ববর্তীদের মধ্যে থেকে বেশী হবে আর পরবর্তীদের মধ্যে থেকে কম। সেটার ব্যাখ্যা এখানে পেতে পারি। ফাতহে মক্কার আগে হলো পূর্ববর্তী আর পরে হলো পরবর্তীগন।
অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এখানে মক্কা বিজয় উদ্দেশ্য। [তাবারী; ইবন কাসীর; জালালাইন; মুয়াসসার] তবে কারও কারও মতে, এর দ্বারা হুদায়বিয়ার যুদ্ধ বোঝানো হয়েছে। [সা’দী]
এর কারণ হলো, ব্যবসা শুরুতে প্রফিটেবল মনে না হওয়া সত্ত্বেও সেখানে ইনভেস্টমেন্ট করা বড় রিস্কের ব্যাপার। এখানে স্যাক্রিফাইস বেশী। কিন্তু ব্যবসা প্রফিটেবল প্রমাণিত হলে সেখানে ইনভেস্টমেন্ট সোজা, স্যাক্রিফাইস কম, রিস্ক কম।
তেমনি ফাতহে মক্কার পূর্বে দ্বীনের সাথে থাকা, খরচ করা, ক্বিতাল করা অনেক বেশী রিস্কি ছিল। মক্কা বিজয়ের পূর্বে বিশ্বাস স্থাপনকারী, জেহাদকারী ও ব্যয়কারীর মর্যাদা অপর শ্রেণী অপেক্ষা বেশী। কারণ, অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে তারা আল্লাহ তা'আলার জন্য এমন সব বিপদাপদের সম্মুখীন হয়েছিলো যার সম্মুখীন অন্য গোষ্ঠীকে হতে হয়নি। এরপরেও টিকে থাকার কারণে তাদের মাকাম অনেক উপরে উঠে গেছে। এখন পরের লোকেদেরও যদি সেই মাকামে পৌছাতে হয় তবে চান্স পাওয়া মাত্রই আল্লাহর রাস্তায় খরচ অথবা জিহাদে চলে যেতে হবে।
Some propose that this verse refers specifically to Abū Bakr’s willingness to spend all of his wealth in the cause of Islam (R). According to a ḥadīth narrated by Ibn ʿUmar, “One time when the Prophet was sitting with Abū Bakr, Gabriel came and inquired about Abū Bakr’s impoverished condition, to which the Prophet responded, ‘O Gabriel, he has spent all his wealth before the victory [over Makkah]!’ Gabriel said, ‘In that case, convey to him God’s greetings of peace and tell him that his Lord asks him, “Are you pleased with Me in your state of poverty or are you averse?”’ The Prophet addressed Abū Bakr, ‘O Abū Bakr, Gabriel is here to convey the greetings of peace from God, and He is asking you whether are you pleased with Him in your state of poverty or are you averse?’ Upon hearing this, Abū Bakr wept and said, ‘How can I be averse unto my Lord? I am pleased with my Lord! I am pleased with my Lord!’” (Qurtubi, Wahidi).
وَ کُلًّا وَّعَدَ اللّٰہُ الۡحُسۡنٰی ؕ وَ اللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ
তবে আল্লাহ্ উভয়ের জন্যই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর তোমারা যা কর আল্লাহ্ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।
অর্থাৎ পারস্পরিক তারতম্য সত্বেও আল্লাহ তা'আলা কল্যাণ অর্থাৎ জান্নাত ও মাগফিরাতের ওয়াদা সবার জন্যেই করেছেন। এই ওয়াদা সাহাবায়ে-কেরামের সেই শ্রেণীদ্বয়ের জন্যে, যারা মক্কাবিজয়ের পূর্বে ও পরে আল্লাহর পথে ব্যয় করেছেন এবং ইসলামের শক্ৰদের মোকাবিলা করেছেন। এতে সাহাবায়ে-কেরামের প্রায় সমগ্র দলই শামিল আছে। তাই মাগফিরাত ও রহমতের এই কুরআনী ঘোষণা প্রত্যেক সাহাবীকে শামিল করেছে। [সা’দী]
তাই যেকোনো সাহাবীর সাথে বেয়াদবি ও তাঁদের একজনের নামেও গালমন্দ ও মন্দ ধারণা পোষণ করা কুরআনের এই আয়াতের বিরুদ্ধে যায়। কেউ যদি যুক্তি তর্ক করতে চায় যে, “কিন্তু অমুক সাহাবী তো হেনতেন করেছে! তার কারণে এই সেই হয়েছে।” তবে উত্তর হবে, আল্লাহ তাঁদের সকলের কল্যাণের প্রতিশ্রতি দেবার পরই বলেছেন وَ اللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ অর্থাৎ, তারা কি করে আর কি করবে সবই তিনি জানেন। রাসুলের সাথে থেকে জিহাদ আর খরচ করার কারণে তাঁদের মর্যাদা এতো উপরে উঠে গেছে যে আর কোন রকম ভুলত্রুটি তা নষ্ট করতে পারবে না। যেমন, এক টুকরো নাপাক সমুদ্রের পানি অপবিত্র করতে পারে না।
নবী করীম (সাঃ) সমস্ত সাহাবা (রাঃ) সম্পর্কে বলেছেন যে, ((لاَ تَسُبُّوْا أَصْحَابِيْ)) "তোমরা আমার সাহাবাদের গালি দিও না। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহর পথে উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ সোনা ব্যয় করে, তবুও তা আমার সাহাবাদের ব্যয়কৃত এক 'মুদ্দ্' (প্রায় ৬২৫ গ্রাম) বরং অর্ধ 'মুদ্দ্' এর সমানও হবে না।" (বুখারী, মুসলিমঃ সাহাবাদের ফযীলত অধ্যায়)



