খারেজি সম্পর্কিত
১.
সালাফীদের মধ্যে খারেজী প্রবণতার কারণ হলো সঠিকভাবে বিস্তারিত উসুল না শেখা। আর হানাফিদের মধ্যে খারেজী প্রবণতার কারণ হলো অতিরিক্ত আকাবির ও মাসলাকপ্রীতি।
২.
আমি মনে করি, যাকে তাকে খারেজি ট্যাগ দেয়াটা সেক্যুলারদের একটি চক্রান্ত। এই চক্রান্তে ইসলামিস্টরা ফেঁসে গেছে। মুরজিয়া ট্যাগাটেগি ইতিহাসে কমবেশি হলেও এভাবে খারেজি ট্যাগাটেগি এতো বেশী হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ সাব্যস্তকারী উম্মাহকে নিজের পরিবার মনে না করে প্রত্যেক মাসলাক অপর মাসলাককে কুফফারদের মতো মনে করছে। বরং কুফফার যেন অন্য মাসলাকের চাইতে প্রিয়। আল্লাহু মুস্তা'আন। নাউযুবিল্লাহ মিন যালিক।
এদের শত্রুতা দেখে বিরক্ত হয়ে, আল্লাহ না করুন, অনেকেই হয়তো দ্বীনই ত্যাগ করে ফেলবে।
৩.
আমি আইএস-কে জাহান্নামের কুকুর খারেজি মনে করি।
৪.
স্পষ্ট আহলুল বিদ'আহর বিপরীতে গ্রেটার আহলুস সুন্নাহর বিশাল জামাআতের ছত্রছায়া তৈরিতে আকিদাহ লিটারেচার হবার কথা ছিল ইউনাইটিং ফোর্স। কিন্তু শাখা-প্রশাখাগত বিষয় আর তাত্ত্বিক বিষয়ে অতিরিক্ত আলোচনা করে একে ডিভাইসিভ ফোর্স বানিয়ে ফেলা হয়েছে। যে বিষয় ইসলামের শিআর, তাকে ওভাররেটেড করে ফেলা হয়েছে!
খোন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহঃ) বলতেন, ❝আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ হলো ইনক্লুসিভ। আর আহলুল বিদআহ ওয়াল ফিরকা হলো এক্সক্লুসিভ।❞
অর্থাৎ আহলুস সুন্নাহর সিফাত হলো তারা সবাইকে নিজেদের ছাতার নীচে আনার চেষ্টা করে। একটা দুটা ভুলের জন্যে আহলুস সুন্নাহ থেকে খারিজ করে দেয় না। একারনেই তাদের জামাআহ বিশাল বড়। অন্যদিকে আহলুল বিদআহ নিজেদের বাদে সবাইকে খারিজ করে দেয়। পান থেকে চুন খসলেই তারা খারিজ!
রাসুলুল্লাহ ﷺ তো বলেছেন, ❝যদি কাউকে বলতে শোন, ❛সব মানুষ তো রসাতলে গেলো❜, তবে মূলত সে নিজেই রসাতলে গিয়েছে।❞
৫. Bearded Bengali:
“শাইখ আবু হামজা আল-মিশরি তার খাওয়ারিজ এবং জি-হাদ বইটাতে হাজার বছর ধরে বিভিন্ন প্রকার খারিজীদের বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ নিয়ে তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক তুলোনা এবং অন্যান্য আলোচনা এনেছেন। অথচ বইটা আই-এসের জন্মের আগে লিখেছিলেন।
উনি একটা ভাইটাল ইনসাইট এনেছিলেন যে, প্রথমযুগের খারিজীরা মিথ্যা বলতো না। বিশেষ করে হারুরি খারিজীরা। কিন্তু এখনকার খারিজীরা মিথ্যা বলা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এরাও শিয়াদের মত তাকিয়া করে। তবে হ্যাঁ, রাফিজী শিয়াদেরও খারিজীদের এক প্রকার ধরা যায়, হাদিসের বর্ণিত বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের আলোকে। তারা তো মিথ্যা বলতোই। তবে মেইনস্ট্রিম খারিজীরা বলতো না, একরা স্ট্যান্ডার্ড ছিল।
আজকাল অনেকে দাবী করতে পারে যে, এখন যাদের খারিজী বলা হচ্ছে তাদের অনেক কিছুই তো স্ট্যান্ডার্ড খারিজীদের সাথে মিলে না। তাহলে তারা খারিজী হবে কিভাবে? এভাবে হবে: তাকফির করে আহলুল ইসলামদের হত্যা করার মাধ্যমে। এই একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য সকল খারিজীদের মধ্যে কমন থাকবে। বাকি বৈশিষ্ট্য তাদের ইমিডিয়েট ফির্কা অনুযায়ী বিভিন্ন পার্থক্য থাকতে পারে।
বইটা সবার জন্য পড়ার সাজেশন রইল। জাস্ট নামটা লিখে গুগল করবেন। না পারলে টরে গিয়ে করবেন। আশা করি পেয়ে যাবেন। আশা করি খারিজী চেনা নিয়ে কোন কনফিউশান থাকবে না। আরো অনেক ইতিহাস, মূলনীতিও জানতে পারবেন। শাইখ এখনও মার্কিন কারাগারে বন্দী আছেন। আল্লাহ তা'আলা তার মুক্তি তরান্বিত করুক, তাকে হেফাজত করুক।”
৬.
ইবন মুলজিম ছিল আলীর (রাঃ) হত্যাকারী। বারাক মুয়াবিয়া (রাঃ)-কে হত্যা করতে চেয়েছিল। আর আমর বিন আবু বকরের দায়িত্ত্ব ছিল আমর বিন আস (রাঃ)-কে হত্যা করা।
ইবন মুলজিম আলী (রাঃ)-কে হত্যা করবার প্ল্যানিং এর সময় তার সহকারীকে বলেছিল, “যদি বেঁচে যাই তাহলে তো অন্তরে তৃপ্তি বোধ করলাম ও প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম হলাম। আর যদি মারা পড়ি তাহলে আল্লাহর কাছে যে প্রতিদান পাব, তা দুনিয়ার থেকে বহুগুণে উত্তম।”
ইমাম যাহাবী বলেন, ইবন মুলজিম মিশর বিজয় অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল। ওখানে সম্মানের সাথে বসবাস করেছিল। সে কুরআন পড়েছিল এবং দীনের আহকাম শিখেছিল। সে ছিল বনু ওয়াতদুলের বাসিন্দা। মিসরে ওই গোত্রের সবচে বড় অশ্বারোহী, খুবই ইবাদতগুজার এবং মুআজ বিন জাবাল রা.-এর শাগরেদ ছিল।
তাবাকাত ইবনে সাদে আছে, ইবন মুলজিমের কপালে স্পষ্ট সিজদার চিহ্ন ছিল। আলীর (রাঃ) শাহাদাতের পর তার শাস্তি নিজ হাতে দেন আবদুল্লাহ ইবন জাফর ইবন আবি তালিব। তার জিহবা কেটে নেবার সময় সে চিৎকার করে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। অথচ এর আগে তার চোখ সেলাই করা হচ্ছি, পা কাটা হচ্ছিল, সে কোনই শব্দ করছিল না। সে সূরা আলাক তেলাওয়াত করছিল। চিৎকার করার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দেয়, “আমি বেঁচে থাকতে এক মুহুর্তও আল্লাহর যিকির ছাড়া কাটাতে চাই না।”
এসব থেকেই বলেন, ইবন মুলজিমকে আপনারা মুনাফেক বলতে পারবেন? তার ইখলাস, তাকওয়া নিয়ে সন্দেহ করতে পারবেন? সে তো মুজাহিদও ছিল। হাফেয ছিল, দ্বীনের আলেম ছিল। কুরআনের মুতাশাবিহাতের ব্যাপারে জ্ঞান ছিল প্রচুর।
এরপরেও কেন তাকে আপনারা খারেজি বলেন? জাহান্নামের কুকুর বলেন? কেন?
[লেখাটি শাইখ হারুন ইজহারের IS ও আবু বকর আল বাগদাদীর প্রতি সফট ভাষা প্রোয়োগের রিয়েকশনে লেখা। তিনি ISIS ও বাগদাদীকে খারেজি না বরং খারেজি প্রভাবিত বলেছিলেন। বাগদাদীকে মুখলিস বলেছিলেন। সেটার প্রেক্ষিতে আমি দেখাতে চেয়েছি বাগদাদী খারেজি না হলে ইবন মুলজিমও খারেজি না। শেষের প্রশ্নটি সার্কাস্টিক্যালি করা।]
৭.
আমি মুরজিয়াদের চাইতে খারেজিদের উম্মাহর জন্য বেশী ক্ষতিকর মনে করি। মনে রাখবেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ খারেজিদের হত্যা করতে আদেশ দিয়েছেন, মুরজিয়াদের নয়।
৮.
খারিজি এবং মুতাজিলাদের মতবাদগুলো মুরজিয়াদের মতবাদের তুলনায় অধিকতর ভ্রান্ত ছিল। এ কারণে মুরজিয়াদের মধ্যে এমন একদল ছিল যাদেরকে ভালো ও প্রশংসনীয় ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু খারিজী ও মুতাজিলাদের সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্বসম্মত মতামত অনুযায়ী নিন্দিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
~ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, কিতাবুল ঈমান
৯.
বিপথগামী খারিজিদের বিরুদ্ধে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধ করতে বলেছেন। আমিরুল মুমিনিন আলি ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু-যিনি খুলাফা রাশিদিনের একজন-তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। সাহাবা কিরাম, তাবিয়িন এবং পরবর্তীকালের দ্বীনের ইমামরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কিন্তু আলি ইবনু আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু), সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) প্রমুখ সাহাবা কিরাম তাদের কাফির বলেননি, বরং যুদ্ধ করা সত্ত্বেও তাদের মুসলিম হিসেবেই গণ্য করেছেন।
শুরুতেই আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেননি। যখন তারা অবৈধ রক্তপাত এবং মুসলিমদের ধন-সম্পদের ওপর হামলা শুরু করল, তখন যুলুম ও অন্যায় ঠেকাতে তাদের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করেছেন। তারা কাফির হয়ে গেছে বলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেননি। এ জন্য তাদের নারীদের বন্দি করেননি এবং তাদের সম্পদকেও গনিমতের মাল মনে করেননি।
নস (কুরআন বা সুন্নাহ) ও ইজমা দ্বারা খারিজিদের পথভ্রষ্টতা প্রমাণিত হওয়ার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তাদের কাফির বলা হয়নি। তাহলে ওই মতবিরোধকারী জামাআতগুলোর বিষয়ে কী বলা হবে, যাঁদের কাছে এমনসব মাসআলায় হক সংশয়পূর্ণ, যেসব বিষয়ে তাদের চেয়ে অনেক বড় বড় ব্যক্তিবর্গও ভুল করেছেন?
কোনো জামাআতের জন্য অন্য জামাআতকে তাকফির করা কিংবা তাদের রক্ত ও ধন-সম্পদকে হালাল মনে করা বৈধ নয়। আর যারা কোনো জামাআতকে কাফির বলে, তারা নিজেরাই যদি-বিদআতি হয় তাহলে কী অবস্থা হবে?
~ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ইবনু তাইমিয়া
১০.
আমি সালাফিজমের প্রতি আকর্ষিত হয়েছিলাম দ্বীনের সহজ সরল স্পষ্ট প্রকাশভঙ্গির কারণে। দীনের মূলনীতিগুলো সালাফিজমের দ্বারা সহজে আয়ত্ত্ব করা যায়। কিন্তু অনেকের আবার এর ফলে বদহজমের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে কমবয়সী চ্যাংড়াগুলো। রক্ত গরম, দ্রুত হুকুম দিতে আগ্রহী। যার কাছ থেকে শিখেছে তাকেই সবার আগে হুকুমে ফেলে মুরজিয়া বানিয়ে ফেলবে। ঠুসঠাস তাকফির করে বসবে।
একদল বলতে চাবে, এটা সালাফিবাদের সমস্যা। না। এটা বয়সের সমস্যা। তাদের ভেতরের উত্তেজনা তারা তাকফীর তাবদি দিয়ে প্রশমনের চেষ্টা করে। খারেজিদের সময় কি সালাফিজম ছিল? খারেজীদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, বয়স হবে কম। সালাফিজম খারেজিদের বৈশিষ্ট্য নয়। বরং খারেজিরা সালাফিজমকে ব্যবহার করে, ব্যস।



